রক্ত দানের উপকারিতা ও অপকারিতা
রক্তদানের আগে কি কি জানা বিশেষ জরুরি
রক্তদানের একটি মহৎ মানবিক কাজ। দুর্ঘটনা, অপারেশন, ডেলিভারি জটিলতা, ক্যান্সার
সহ বিভিন্ন চিকিৎসায় রোগের জীবন বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। একজন
সুস্থ ও যোগ্য ব্যক্তি নিয়ম মেনে রক্তদান করলে অন্য একজনের জীবন রক্ষায়
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে রক্ত দান করার আগে এর উপকারিতা সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এবং কারা রক্ত
দিতে পারবেন বা পারবেন না এই বিষয় জানা প্রয়োজন।
সূচিপত্রঃ রক্ত দানের উপকারিতা ও অপকারিতা
আসুন জেনে নেই রক্তদান কি?
রক্তদান হলো একজন সুস্থ ব্যক্তির শরীর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করে
প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা প্রক্রিয়াকেই রক্তদান বলা
হয়।
বেশিরভাগ দেশেই রক্তদাতা হলেন স্বেচ্ছায় রক্তদাতা যারা সামাজিক দায়বদ্ধতা
থেকে রক্তদান করেন। এক্ষেত্রে দেখা যায় দরিদ্র দেশগুলোতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠিত
স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা অনেক কম বেশিরভাগ রক্তদাতাই কেবল তাদের পরিচিতজনদের
প্রয়োজনে রক্তদান করে থাকেন। তবে কিছু মানুষ পেশাদার রক্তদাতা অর্থাৎ তারা অর্থে
বা কোন ভাতার বিনিময়ে রক্তদান করে থাকেন। আবার রক্তদান তার ভবিষ্যৎ প্রয়োজনে
রক্ত পেতে পারেন।
সাধারণত রক্তদানের সময় লোহিত রক্ত কণিকা বা পুরো রক্ত সংগ্রহ করা
হয়। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তকে বিভিন্ন উপাদানে ভাগ করা যেতে
পারে।
যেমনঃ
- লোহিত রক্ত কণিকা (Red Blood Cells)
- প্লাজমা (Plasma)
- প্লাটিলেট (Platelets)
এবার আমরা জানবো রক্তদানের উপকারিতা
একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।
রক্তদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকার হলো-আপনার দেওয়া রক্ত প্রয়োজনীয়
রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার হয়ে জীবন রক্ষায় সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে
দুর্ঘটনা, বড় অপারেশন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা কিছু রক্ত জনিত রোগের
ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন হতে পারে।
রক্তের জরুরী মজুদ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাংকের পর্যাপ্ত রক্তের মজুদ থাকা জরুরী। নিয়মিত
স্বেচ্ছায় রক্ত দান করলে জরুরী সময়ে প্রয়োজনীয় রক্ত পাওয়া সম্ভাবনা বেড়ে
যায়।
রক্তের বিভিন্ন উপাদান প্রয়োজনীয় রোগীর কাজে লাগতে পারে।
সংগৃহীত রক্ত প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন উপাদান আলাদা করা যায়। ফলে একজন
দাতার দেওয়া রক্তের উপাদান একাধিক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহারের সুযোগ হতে
পারে।
রক্তদানের পর শরীরের নতুন রক্ত কণিকা তৈরি হয়।
রক্তদানের পর শরীরে হারানো রক্তের উপাদান পূরণ করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া শুরু
হয়। প্লাজমা তুলনামূলক দ্রুত পূরণ হয় এবং লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতেও শরীরের কাজ
করে। তবে এটিকে কোন বিশেষ রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার উপায় হিসেবে বিবেচনা করা
উচিত নয়।
সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব পালনে ভূমিকা রাখে।
স্বেচ্ছায় রক্তদান সমাজের প্রতি মানবিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ
উপায়। বিশেষ করে নিয়মিত নিরাপদ রক্তদান রক্তের সংকট মোকাবেলায় সহায়তা করতে
পারে।
এবার আমরা জানব রক্তদানের সম্ভাব্য অপকারিতা বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগেঃ
কিছু মানুষের রক্তদানের পর সাময়িকভাবে
মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা অস্থিরতা হতে পারে। সাধারণত কিছুক্ষণ বিশ্রামও পর্যাপ্ত
তরল পান করলে ভালো হয়ে যায়।
বমি বমি ভাবঃ
কিছু তার ক্ষেত্রে রক্তদানের সময় বা পড়ে বমি বমি
ভাব হতে পারে। এমন হলে শুয়ে বসে বিশ্রাম নেওয়া উচিত।
অজ্ঞান হয়ে যাওয়াঃ
কখনো কখনো রক্ত দেখার ভয়ে, উদ্বেগ, দীর্ঘ
সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা রক্তদানের শরীর বৃত্তীয় প্রক্রিয়ার কারণে একজন
দাতার সাময়িকভাবে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।
যেখানে সূঁচ দেওয়া হয়েছে সেখানে ব্যথা বা কালশিটেঃ
রক্তের
সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত সূঁচের জায়গায় সামান্য ব্যথা, কালশিটে হতে পারে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি নিজে থেকেই কমে যায়।
বারবার রক্তদানে আয়রনের ঘাটের ঝুঁকিঃ
নিয়মিত রক্তদান করলে
শরীর থেকে আয়রন কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ঘন ঘন রক্তদান করলে কিছু মানুষের
আয়রন ঘাটতি বা আইরন ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া ঝুঁকি মারতে পারে।
তাই রক্তদানের ক্ষেত্রে অনুমোদিত রক্তদান কেন্দ্রের নির্ধারিত সময় ব্যবধান ও
যোগ্যতার নিয়ম মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
কারা কারা রক্ত দিতে পারবেন?
রক্তদানের যোগ্যতা দেশ, রক্তদান কেন্দ্র এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর
নির্ভর করে। সাধারণভাবে রক্তদাতা কে-
- সুস্থ শারীরিকভাবে সক্ষম হতে হবে
- নির্ধারিত বয়স ও জনের শর্ত পূরণ করতে হবে
- রক্তদানের আগে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে হবে
- রক্তদানের সময় প্রয়োজনীয় স্ক্যানিংয়ে উপযুক্ত হতে হবে
শুধু বয়স বা ওজন ঠিক থাকলেই রক্ত দান করা যাবে এমন নয়। রক্ত দান
কেন্দ্রে চিকিৎসা সংক্রান্ত নির্দেশনা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।
রক্তদানের আগে কি কি করতে পারবেন?
রক্তদান করার আগে কিছু সাধারণ বিষয় মনে রাখা দরকার-
- পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিন
- খালিপেটে রক্তদান না করাই ভালো
- স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবার খান
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন
- আপনার কোন রোগ, ওষুধ সেবন বা সাম্প্রতিক চিকিৎসার তথ্য গোপন করবেন না
- রক্তদান কেন্দ্রের স্বাস্থ্য স্ক্যানিংয়ের
রক্ত দানের পর দীর্ঘ সময় অসুস্থ লাগলে বা অস্বাভাবিক কোন উপসর্গ দেখা দিলে
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নিন।
রক্ত দান করলে কি শরীরের ক্ষতি হয়?
সুস্থ যোগ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিরাপদ পদ্ধতিতে রক্তদান সাধারণত শরীরের জন্য
ক্ষতিকর নয়। তবে রক্তদানের পর স্বাভাবিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা সূঁচের স্থানে ব্যথা হতে পারে।
অন্যদিকে, খুব ঘন ঘন রক্ত দান করলে কিছু মানুষের আয়রন ঘাটতি হতে পারে। তাই
নির্ধারিত সময়ের আগে বারবার রক্ত দান না করে রক্তদান কেন্দ্রের নিয়ম মেনে
চলা উচিত।
রক্তদান করলে কি শরীর দুর্বল হয়ে যায়?
রক্ত দানের পর কিছু মানুষের সামরিক দুর্বলতা বা মাথা ঘোরা হতে পারে। তবে সুস্থ ও
যোগ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীরের সাধারণত হারানো রক্তের উপাদান ধীরে ধীরে পূরণ
করে।
যদি বারবার বা অতিরিক্ত ঘন ঘন রক্ত দান করা হয়, তাহলে আয়রনের ঘাটতির মত সমস্যা
হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
রক্তদান করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কি?
রক্তদান অবশ্যই নিরাপদ ও অনুমোদিত রক্তদান কেন্দ্র বা হাসপাতালের মাধ্যমে করা
উচিত।
রক্তদাতার স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সংগ্রহীত রক্তের
সংক্রমণ সংক্রান্ত স্ক্যানিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের স্বাস্থ্যগত তথ্য গোপন
করে রক্তদান করা উচিত নয়।
শেষ কথাঃ
রক্তদান একটি মানবিক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। তবে রক্তদান
করার আগে, নিজের স্বাস্থ্য যোগ্যতা এবং রক্তদান কেন্দ্রের নিয়ম বিবেচনা করা
জরুরী। সুস্থ ও যোগ্য ব্যক্তি নিরাপদ পরিবেশে নিয়ম মেনে রক্তদান করলে তা
প্রয়োজনীয় রোগীর চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রক্তদান করুন, তবে নিরাপদ নিয়মে এবং যোগ্যতা নিশ্চিত করে।



শাওন ল্যাব এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url