রক্তে ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাএা, লক্ষণ, কারণ ও নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ গাইড
রক্তে চিনি বা রক্তে শর্করা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে
খাবার খাই, বিশেষ করে ভাত, রুটি, আলু, ফলমুল ও অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট জাতীয়
খাবার থেকে শরীর গুলুকোজ তৈরি করে। এই গুলুকোস রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিবিন্ন
কোষে পেীছে শক্তি সরবরাহ করে।

তবে রক্তে শর্করার মাএা যদি দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বা কম থাকে,
তাহলে শররে ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের
ক্ষেত্রে ব্লাড সুগার সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
ব্লাড সুগার বা রক্তে শর্করা কী ?
ব্লাড সুগার বলতে মূলত রক্তে থাকা গুলুকোজের পরিমানকে বোঝায়।
গুলুকোষ শরীরের অন্যতম প্রধান জ্বালানি। আমরা খাবার খাওয়ার পর খাবারের
কার্বোহাইড্রেট বেঙে গুলুকোজ তৈরি হয়। এরপর অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন গুলুকোজকে
শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
সহজভাষায় বলা যায়ঃ
খাবার + গুলুকোজ + রক্তে প্রবেশ + ইনসুলিনের সহায়তায় কোষে প্রবেশ + শরীরে
শক্তি উৎপন্ন
যখন শররে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না অথবা ইনসুলিন ঠিকভাবে কাঝ না করে,
তখন রকোত গুলুকোজ এর মাএা বেড়ে যেতে পারে।
ব্লাড সুগার কেনো পরিক্ষা করা হয় ও তার স্বাভাবিক মাএা কত ?
রক্তে শর্করা মাএা কমে গেছে না বেড়ে গেছে তা জানার জন্য এই ব্লাড সুগার
পরিক্ষা করা হয়।
স্বাভাবিক মাএাঃ
ব্লাড সুগার স্বাভাবিক মাএা জানার জন্য সব তথকে বেশি জরূরি কখন বা
কোন সময় টেস্টটি করা হয়েছে। কারন খালি পেট, ভরা পেট বা HbA1c প্রতিটির আলাদা
আলাদা মাএা রয়েছে।
১. Fasting ( থাবার আগে )
সাধারণত অন্তত ৮ ঘন্টা না খেয়ে সকালে যে রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা হয় তাকে
Fasting ব্লাড সুগার বলা হয়।
২. খাবার পরে ব্লাড সুগারঃ
খাবার পর রক্তের গুলুকোজ স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটিা বাড়ে। পরীক্ষার সময় এবং খাবারের
ধরণ অনুযায়ী ফলাফল পরিবর্তন হতে পারে।
৩. HbA1c
HbA1c পরীক্ষার মাধ্যমে গত ২-৩ মাসের গড় রক্তে শর্করা মাএা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া
যায়।
ব্লাড সুগার কমে গেলে বা বেড়ে গেলে কি কি লক্ষণ দেখা দিতে পারেঃ
রক্তে শর্করা বেশি হলে ( হাইপারগ্লাইসেমিয়া ) কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে
পারে।
যেমনঃ
- ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া
- অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা
- শরীর দূর্বল বা ক্লান্ত লাগা
- চোখে ঝাপসা দেখা
- ক্ষত শুকাতে বেশি সময় লাগা
- ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
তবে মনে রাখবেন ব্লাড সুগার বেশি থাকলেও অনেকের কোন স্পষ্ট লক্ষন নাও থাকতে
পারে। এজন্য শুধুমাএ লক্ষণের ওপর নির্ভ র না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা
গুরুত্বপূর্ন ।
রক্তে শর্করা কম হলে ( হাইপোগ্লাইসেমিয়া ) কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে
পারে।
যেমনঃ
- কাঁপুনি
- অতিরিক্ত ঘাম
- ক্ষুদা লাগা, মাথা ঘোরা
- দুর্বলতা, বুক ধড়ফড় করা
- অস্তিরতা বা বিরক্তি লাগা
- মনোযোগ দিতে সমস্যা
ব্রাড সুগার মাপার প্রধান পরীক্ষাঃ
- Fasting Blood Suger (FBS)
- Random blood Suger (RBS)
- Postprandial Blood Suger (PPBS)
- HbA1c
অনেক ক্ষেত্রে OGTT পরিক্ষাও করা হয়।
ব্লাড সুগার বাড়ার প্রধাণ কারন কি?
ব্লাড সুগার বাড়ার একাধিক কারন থাকতে পারে।
যেমন:
১. খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চিনি যুক্ত খাবার খাওয়া।
২. শারীরিক পরিশ্রমরে অভাবঃ নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম কম হলে।
৩. অতিরিক্ত ওজনঃ পেটের আশে পাশে অতিরিক্ত চর্বি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের
সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
৪. পারিবারিক ইতিহাসঃ পারিবারিক ডায়বেটিস থাকলে ভবিষ্যত
হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৫. মানসিক চাপঃ দীর্ঘস্থায়ী মানসীক চাপ শরীরের বিভিন্ন হরমোনের ওপর প্রভাব
ফেলতে পারে এবং কিছু মানুষের ব্লাড সুগার বেড়ে যেতে পারে।
৬. অসুস্থতাঃ কোন শারিরীক অসুস্থতার সময় শরীরে স্ট্রেস হরমোন বাড়ার কারনে ব্লাড সুগার বেড়ে যেতে পারে।
৭. ওষুধঃ কিছু কিছু ওষুধ এর কারনে ব্লাড সুগার বেড়ে যেতে পারে।
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রনের খাবারে ভূমিকাঃ
যে খাবারগুলো খাবেনঃ লাল আটার রুটি, ডাল, শাকসবজি, ব্রাউন রাইস/লাল
চাল, মুরগি মাছ (কম তেলে), বাদাম, দই (চিনি বিহীন), আপেল, পেয়ারা।
যে খাবারগুলো খাবেন নাঃ মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার, কেক, চিনি যুক্ত
পানিয়, ভাজাপোড়া খাবার, ফাস্ট ফুড, চিপস, সাদা চালের ভাত, পরোটা, মধু
(অতিরিক্ত)।
কিছু অতিরিক্ত পরামর্শঃ নিয়মিত সময়ে সুষম খাবার খান, পর্যাপ্ত পানি
পান করুন, প্রতিদিন অন্তত 30 মিনিট হাঁটুন, ওজন নিয়ন্ত্রণে
রাখুন, ধূমপান ও মধ্য পান এড়িয়ে চলুন, পর্যাপ্ত ঘুমান।
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রনের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস াত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ন।
মনে রাখবেনঃ ডায়াবেটিস থাকলেই সব ধরণের ভাত বা ফল সম্পূর্ন বন্ধ করতে হবে
এমন নয়। খাবরের ধরন পরিমান ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী খাদ্য পরিকল্পনা করা
সবচেয়ে ভাল।
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ মানেই কি শুধু মিষ্টি বাদ দেওয়া?
উওরঃ না
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রন একটি সামগ্রিক বিষয়। শুধু মিষ্টি কমানোই যথেষ্ট
নয়। খাবারের পরিমান, মোট কার্বোহাইড্রেট গ্রহন, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম,
ওজন, মানসিক চাপ, ওষুধ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সবকিছুই সমন্ধিত ভূমিকা
রয়েছে।
একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার জন্য
গুরুত্বপূর্ন।
শেষ কথাঃ
ব্লাড সুগার আমাদের শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু রক্তে
শর্করার মাএা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের বাইরে থাকলে তা স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক
প্রভাব ফেলতে পরে।
তােই সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক কার্যক্রম
এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া েএই বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া
উচিত।
সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন
আজকের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই আগামী দিনের সুস্থতার ভিত্তি তৈরি করতে
পারে।



শাওন ল্যাব এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url